চিবা, জাপান
চিবা, জাপানের এক শান্ত শহর।
যেখানে গাড়ির শব্দ চেরি ব্লসমের মৃদু গন্ধের সাথে মিশে যায়, আকিরা নাকাই নামের এক ছোট্ট ছেলে ইঞ্জিনের শব্দের প্রেমে পড়ে। তাকে আকর্ষণ করত না আধুনিক, চকচকে গাড়িগুলো বরং পুরনো গাড়ি গুলো তাকে মুগ্ধ করতো। সে সময় কে জানত এই শৈশবের টান একদিন তাকে গ্লোবাল কার কালচারের কিংবদন্তিতে পরিণত করবে?
▪️শুরুর দিনগুলো – সংগ্রাম, এবং গ্যারেজের স্বপ্ন:
১৯৭৩ সালে জন্ম নেওয়া নাকাই প্রযুক্তির দেশ জাপানে বড় হয়েছেন। কিন্তু তার পছন্দ ছিল অ্যানালগ। কিশোর বয়সেই স্থানীয় গ্যারেজে লুকিয়ে ঢুকে পড়তেন, হাত দিয়ে মেটাল কাটা, গ্রাইন্ড করা, গঠন করা শিখতেন। হাই স্কুল ড্রপ আউট করেন, যা তার পরিবারকে হতবাক করলেও তাকে মুক্তি দিয়েছি।
১৯৯০-এর দশকে, তিনি চিবায় *অটো স্ট্র্যাডল* নামে একটি ছোট টিউনিং শপ প্রতিষ্ঠা করেন। তখন নাকাই সম্পূর্ণ ড্রিফটিং-এর জগতে মগ্ন ছিলেন—জাপানের এই অ্যাড্রেনালিন নির্ভর মোটরস্পোর্ট যেখানে ড্রাইভাররা গাড়িগুলোকে সাইডওয়েজে ডান্স করে। তিনি নিসান সিলভিয়া এবং টয়োটা AE8 মডিফাই করতেন, যেগুলো পাহাড়ি রোডে গর্জন করত।
▪️টার্নিং পয়েন্ট , একটি পোর্শে যা সব বদলে দিল**
১৯৯৭ সালের এক বৃষ্টিভেজা রাতে, ভাগ্য নাকাইয়ের হাতে এনে দিল একটি মরিচা ধরা ১৯৭৮ সালের পোর্শে ৯৩০ টার্বো। অনেকেই এটাকে ধ্বংসস্তূপ ভাবলেও নাকাই দেখলেন এক ক্যানভাস। খেয়ালের বশে, তিনি এটা ড্রিফটিং করতে নিয়ে গেলেন। গাড়িটির রিয়ার ইঞ্জিনের ওজন এবং টার্বোচার্জড রাগড ছিল , কিন্তু নাকাই এটাকে বশ মানালেন, জাপানি টিউনার গাড়িগুলোর সাথে এমন কানেকশন তিনি আগে কখনো অনুভব করেননি। পোর্শের আত্মা, তার সাথে কথা বলতে শুরু করলো ।
এই ব্যাপারটা তার ভিতরে এক আগুন জ্বালিয়ে দিল। নাকাই তার ড্রিফট কারগুলো বিক্রি করে দিলেন, পোর্শেটিতে সব সঞ্চয় ঢেলে দিলেন, এবং তার অগোছালো গ্যারেজে এর ট্রান্সফরমেশন করতে শুরু করলেন। তিনি ফেন্ডার কেটে ফেললেন, ওয়াইড বডির প্যানেল লাগালেন, এবং এটাকে এতটা নিচু করলেন যে গাড়িটি যেন রাস্তাকে জড়িয়ে ধরে থাকা এক শিকারীর মতো মনে হলো । যখন তিনি গাড়িটি উন্মোচন করলেন, সমালোচকরা বিদ্রূপ করলেন। কিন্তু কার এন্থুসিয়াস্টরা বুঝেছিল এটা শুধু গাড়ি ছিল না এটা ছিল হৃদয়ে দাগ কাটার মতো একটি শিল্প।
▪️আরডব্লিউবির জন্ম: রাফ ওয়ার্ল্ড
২০০৫ সালে, নাকাই প্রতিষ্ঠা করলেন রাউ-ভেল্ট বেগ্রিফ (RWB), জার্মান ভাষায় যার অর্থ “রাফ ওয়ার্ল্ড কনসেপ্ট”। এই নামটি তার দর্শনের প্রতিফলন । সে একাই কাজ করেন, চেইন-স্মোকিং করতে করতে এবং তেল-মাখা জামা পরে, নাকাই পুরনো এয়ার-কুল্ড পোর্শেগুলোকে পুনর্জীবিত করতে শুরু করলেন। ৯৩০, ৯৬৪, ৯৯৩ প্রতিটিকে এক কর্কশ, চওড়া-বডির দানবে রূপান্তরিত করেন।
তার কাজের ধরন ছিল রীতিমতো অবাক করার মতো। তিনি চোখে মেপে গাড়ির ফেন্ডার কাটতেন, অ্যাঙ্গেল গ্রাইন্ডার দিয়ে হাতের কাজ করতেন, এবং খোলা রিভেট দিয়ে চওড়া আর্চ লাগাতেন। কোনো কম্পিউটার, কোনো ব্লুপ্রিন্ট নয় কেবল অন্তর্দৃষ্টি। প্রতিটি গাড়ি বানাতে তার কয়েকদিন, কখনো সপ্তাহ লেগে যেত, নাকাই তার দোকানেই ঘুমাতেন। ক্লায়েন্টরা শুধু গাড়ি পেতেন না পেতেন তার হৃদয়ের এক অংশ। তিনি গাড়িগুলোর নাম দিতেন পুরনো বন্ধুর মতো: “স্টেলা আর্টোয়া,” “পান্ডোরা ওয়ান,” “দারুমা ৯.”
—
▪️বৈশ্বিক খ্যাতি: চিবা থেকে বিশ্বজুড়ে
নাকাইয়ের “পোর্শে সামুরাই” গাড়ির খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ২০১০ সালে, একটি অন্ধকার গ্যারেজে তার গাড়ি বানানোর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। হঠাৎ করেই, দুবাই থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস, অনেকে তাকে তাদের পোর্শে ট্রান্সফর্ম করার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে লাগলেন। সেমা এন্ড গুডউড ফেস্টিভ্যাল অফ স্পিড এর মতো ইভেন্টে ভিড় জমত তাকে কাজ করতে দেখার জন্য।
কিন্তু খ্যাতি তাকে বদলাতে পারেনি। তিনি আজও সহকারী নিতে অস্বীকার করেন, পারফেকশনিস্টদের উপহাস করেন, এবং অবিশ্বাস্য কম দাম নেন। তিনি বলেন, “অতিরিক্ত পলিশ করলে গাড়ির আত্মা মরে যায়।”
▪️দ্যা ম্যান বিহাইন্ড দ্যা মিথ
নাকাইয়ের জীবন অতটা সুখের নয়। ২০১৮ সালে, জার্মানির নুরবুর্গরিং-এ একটি প্রাণঘাতী এক্সিডেন্টে তার হাড় ভেঙে যায় এবং পোর্শেটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়। সমালোচকরা প্রশ্ন তুললেন, তার গাড়িগুলো কি শুধু “স্টাইল ওভার সাবস্ট্যান্স”। নাকাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন “আমি প্যাশনের জন্য বানাই, ল্যাপ টাইমের জন্য নয়,” কয়েক সপ্তাহ পরেই নতুন গাড়ি বানাতে শুরু করলেন।
আজও তিনি এক রহস্য যে ব্যক্তি সুপ্রিম হুডি পরে কিন্তু সন্ন্যাসীর মতো বাস করে, যার হাত খসখসে কিন্তু সৌন্দর্য ক্রিয়েট করে। তিনি *রেইস হুইলস* এবং *রোটিফর্ম* এর সাথে কাজ করেন, কিন্তু তার মন এখনও চিবায়, যেখানে RWB-এর ওয়ার্কশপে এখনও কাটা মেটাল এবং পোড়া রাবারের গন্ধ ভাসে।
▪️লিগ্যাসি: আর্ট অফ ইমপারফেকশন।
আকিরা নাকাই কখনো বিখ্যাত হতে চান নি। তিনি শুধু তার আবেগের পিছু ছুটেছেন, ভাঙা পোর্শেগুলোকে চলন্ত ভাস্কর্যে রূপান্তরিত করেছেন। একটি RWB গাড়ির মালিক হওয়া মানে তার গল্পের এক টুকরো মালিকানা। এমন একটি গল্প যেখানে সংগ্রাম মিলিত হয় নান্দনিকতার সাথে, যেখানে ত্রুটিগুলো সেলিব্রেট করা হয়।
তিনি প্রায়ই বলেন, “There’s no right way to build a car. Just your way.”
নাকাইয়ের একটা কথা আমার খুব পছন্দের
“I don’t make cars. I wake them up.”
আপনি যদি একজন কার এন্থুসিয়াস্ট হন তবে অবশ্যই Kar Knight কে ফলো করুন।